এআইয়ের চাপে বাড়ছে স্মার্টফোনের দাম, কমতে পারে র‍্যাম

Staff Reporter

নিজস্ব প্রতিবেদক

সোমবার, ৯ মার্চ ২০২৬, ১৬:১৫

এআইয়ের চাপে বাড়ছে স্মার্টফোনের দাম, কমতে পারে র‍্যাম
ছবি : টাইমস অব ইন্ডিয়া

স্মার্টফোন কিনতে গেলে সামনে নতুন এক বাস্তবতা অপেক্ষা করছে। আগামী সময়ে একই ধরনের ফোন কিনতে হয়তো আগের চেয়ে বেশি টাকা খরচ করতে হবে। আবার অনেক ক্ষেত্রে একই দামে কম র‍্যামও পেতে পারেন ব্যবহারকারীরা। প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের ভাষায়, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির বিস্তারই তৈরি করেছে এই নতুন চাপ, যার নাম দেওয়া হচ্ছে ‘এআই ট্যাক্স’।

বিশ্বজুড়ে এআই উন্নয়নের কারণে মেমোরি চিপের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে স্মার্টফোন ও ল্যাপটপ তৈরির খরচও বাড়ছে। সাম্প্রতিক সময়ে অ্যাপল, স্যামসাং ও নাথিংসহ কয়েকটি বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের নতুন ডিভাইস আগের সংস্করণের তুলনায় কিছুটা বেশি দামে বাজারে এনেছে।

এআইয়ের জন্য বাড়ছে চিপের চাহিদা

ইন্টারন্যাশনাল ডেটা করপোরেশনের ক্লায়েন্ট ডিভাইস বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সিসকো জেরোনিমোর মতে, স্মার্টফোন নির্মাতারা মূলত মেমোরির দাম বেড়ে যাওয়ার কারণেই ডিভাইসের দাম বাড়াতে বাধ্য হচ্ছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে কিছু ক্ষেত্রে মেমোরির দাম ২০০ থেকে ৩০০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

সব ধরনের কম্পিউটিং ডিভাইসে র‍্যাম বা র‌্যান্ডম অ্যাকসেস মেমোরি ব্যবহৃত হয়। এটি কম্পিউটারের স্বল্পমেয়াদি স্মৃতির মতো কাজ করে এবং একসঙ্গে একাধিক অ্যাপ চালাতে সহায়তা করে। স্মার্টফোন, ট্যাবলেট, ল্যাপটপ থেকে শুরু করে গাড়ির ইনফোটেইনমেন্ট সিস্টেম ও ভিডিও গেম কনসোলেও এই মেমোরি ব্যবহার করা হয়।

গত কয়েক বছরে র‍্যাম উৎপাদন সাধারণ চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই চলছিল। মহামারির সময় সাময়িক সংকট দেখা দিলেও পরে সরবরাহ স্বাভাবিক হয়। কিন্তু এখন এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের কারণে পরিস্থিতি আবার বদলে গেছে।

ওপেনএআই, মেটা ও গুগলের মতো প্রতিষ্ঠান বিশাল ডেটা সেন্টারে এআই চালাতে বিপুল পরিমাণ মেমোরি ব্যবহার করছে। এই ডেটা সেন্টারগুলোতে সাধারণ ইলেকট্রনিক ডিভাইসের তুলনায় অনেক বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন মেমোরি দরকার হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এনভিডিয়ার রুবিন জিপিইউতে নতুন প্রজন্মের এইচবিএম৪ মেমোরি সর্বোচ্চ ২৮৮ গিগাবাইট পর্যন্ত থাকতে পারে। একটি সার্ভার সিস্টেমে আবার ৭২টি জিপিইউ একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে স্মার্টফোনে সাধারণত ৮, ১২ বা সর্বোচ্চ ১৬ গিগাবাইট র‍্যাম থাকে।

সীমিত উৎপাদনের কারণে বাড়ছে সংকট

বিশ্বে র‍্যাম উৎপাদনের বড় তিন প্রতিষ্ঠান হলো স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স ও মাইক্রন। এই তিন প্রতিষ্ঠানই বিশ্ববাজারের প্রায় ৯৩ শতাংশ সরবরাহ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় সরবরাহ দ্রুত সংকুচিত হয়ে পড়েছে।

এআই কোম্পানিগুলো তাদের ডেটা সেন্টারের জন্য দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ মেমোরি কিনে নিচ্ছে। ফলে স্মার্টফোন নির্মাতারা পর্যাপ্ত মেমোরি পেতে প্রতিযোগিতায় পড়ছে।

এমনকি বিশ্বের সবচেয়ে বড় স্মার্টফোন নির্মাতা স্যামসাংও নিজস্ব ফোনের জন্য অবারিত র‍্যাম পায় না। কারণ স্যামসাং সেমিকন্ডাক্টর বিভাগ বৈশ্বিক বাজারে মেমোরি বিক্রি করে এবং বেশি দাম দিতে পারে এমন ক্রেতাদের অগ্রাধিকার দেয়। ফলে গ্যালাক্সি ফোন তৈরির বিভাগকেও অন্য কোম্পানির মতোই সরবরাহের জন্য প্রতিযোগিতা করতে হয়।

ফোন নির্মাতাদের ওপর বাড়ছে চাপ

বিশ্লেষকদের মতে, র‍্যাম সংকটের প্রভাব সব ফোন নির্মাতার ওপর পড়ছে। তবে ছোট ব্র্যান্ডগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। কারণ তাদের লাভের পরিমাণ কম এবং উপাদানের দাম বাড়লে তা সামাল দেওয়া কঠিন।

প্রিমিয়াম বাজারে শক্ত অবস্থানের কারণে অ্যাপল ও স্যামসাং তুলনামূলকভাবে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। তাদের আর্থিক সক্ষমতা বেশি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলেও প্রভাব রয়েছে। ফলে তারা কিছু বাড়তি খরচ নিজেদের মধ্যে সামলাতে পারে।

এরই মধ্যে স্যামসাং তাদের গ্যালাক্সি এস২৬ সিরিজের দাম বাড়িয়েছে। নতুন সিরিজে গ্যালাক্সি এস২৬-এর দাম শুরু প্রায় ১ লাখ ১৬ হাজার ১৫৯ টাকা। এস২৬ প্লাসের দাম প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার ৩৯৯ টাকা এবং এস২৬ আল্ট্রার দাম প্রায় ১ লাখ ৮৪ হাজার ৭৯৯ টাকা। গত বছর বাজারে আসা এস২৫ সিরিজের তুলনায় এটি উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি।

তুলনামূলকভাবে এস২৫ সিরিজের শুরুর দাম ছিল প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার ৯১৯ টাকা। এস২৫ প্লাসের দাম ছিল প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার ৯৯৯ টাকা এবং এস২৫ আল্ট্রার দাম ছিল প্রায় ১ লাখ ৭১ হাজার ৫৯৯ টাকা।

শুধু প্রিমিয়াম ফোন নয়, স্যামসাং তাদের এম ও এফ সিরিজের মধ্যম দামের ফোনগুলোর দামও সমন্বয় করেছে। এটি দেখায় যে মেমোরির দাম বাড়ার প্রভাব এখন পুরো বাজারেই পড়ছে।

ব্রিটিশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান নাথিংও একই পথ অনুসরণ করেছে। নতুন ফোন ৪এ সিরিজে ফোন ৪এ-এর দাম প্রায় ৪২ হাজার ২৩৯ টাকা এবং ৪এ প্রোর দাম প্রায় ৫২ হাজার ৭৯৯ টাকা। এক বছর আগে বাজারে আসা ৩এ ও ৩এ প্রোর দাম ছিল যথাক্রমে প্রায় ৩০ হাজার ৩৫৯ টাকা ও ৩৬ হাজার ৯৫৯ টাকা।

লেনোভোর মালিকানাধীন মোটোরোলাও নতুন এজ ৭০ ফোনের দাম বাড়িয়েছে। এই মধ্যম দামের ফোনের দাম প্রায় ৩৫ হাজার ৬৩৯ টাকা, যেখানে আগের এজ ৬০ মডেলের দাম ছিল প্রায় ৩০ হাজার ৩৫৯ টাকা।

অন্যদিকে অ্যাপলও সম্প্রতি আইফোন ১৭ই-এর দাম বাড়িয়েছে। ফোনটির ভারতে দাম প্রায় ৮৫ হাজার ৬৬৮ টাকা, যা আগের মডেলের তুলনায় প্রায় ৬ হাজার ৬০০ টাকা বেশি।

সবচেয়ে বেশি চাপে মধ্যম দামের ফোন

বিশ্লেষকদের মতে, প্রায় ২৬ হাজার ৪০০ টাকা থেকে ৬৬ হাজার টাকা দামের মধ্যম স্তরের স্মার্টফোনগুলো এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তবে সবচেয়ে বড় ঝুঁকিতে রয়েছে কম দামের ফোনের বাজার।

আগে প্রায় ১৩২ ডলার সমমানের ফোনগুলো এখন ভবিষ্যতে ১৯৮ থেকে ২৬৪ ডলার সমমানের দামে পৌঁছাতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

এআই ফোনের ভবিষ্যৎও চ্যালেঞ্জে

বর্তমানে অনেক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের স্মার্টফোনকে ‘এআই ফোন’ হিসেবে বাজারজাত করছে। এসব ফোনে এমন এআই সহকারী যুক্ত করা হচ্ছে, যা ব্যবহারকারীর উদ্দেশ্য বুঝে বিভিন্ন অ্যাপ সমন্বয় করে কাজ সম্পন্ন করতে পারে।

কিন্তু ডিভাইসের ভেতরে এআই চালাতে হলে বেশি র‍্যাম দরকার। ফলে র‍্যাম সংকটের কারণে ডিভাইসে এআই চালানোর পরিকল্পনাও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

ল্যাপটপ বাজারেও একই প্রভাব

র‍্যামের দাম বাড়ার প্রভাব ল্যাপটপ বাজারেও পড়ছে। ডেল, এইচপি, আসুসসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান তাদের ল্যাপটপের দাম বাড়িয়েছে। লেনোভো জানিয়েছে, ২০২৬ সালে তাদের কম্পিউটারের গড় বিক্রয়মূল্য বাড়বে।

অ্যাপলের নতুন এম৫ চিপের ম্যাকবুক এয়ার-এর দাম শুরু প্রায় ১ লাখ ৫৮ হাজার ২৬৮ টাকা, যেখানে আগের মডেলের দাম ছিল প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার ৮৬৮ টাকা। অর্থাৎ প্রায় ২৬ হাজার ৪০০ টাকা বেশি।

অন্যদিকে অ্যাপল নতুন একটি সাশ্রয়ী ল্যাপটপ এনেছে। ম্যাকবুক নিও নামের এই ডিভাইসটির দাম প্রায় ৯২ হাজার ৪০০ টাকা।

সামনে কী হতে পারে

বিশ্লেষকদের মতে, র‍্যাম সংকট দ্রুত শেষ হওয়ার সম্ভাবনা নেই। নতুন মেমোরি কারখানা স্থাপন করতে সাধারণত দুই থেকে তিন বছর সময় লাগে। একই সময়ে এআই ডেটা সেন্টারের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে।

তাই অন্তত ২০২৭ সাল পর্যন্ত মেমোরির ঘাটতি থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমনকি সরবরাহ বাড়লেও মেমোরির দাম আগের মতো কমে যাওয়ার সম্ভাবনা কম।

ইন্টারন্যাশনাল ডেটা করপোরেশন পূর্বাভাস দিয়েছে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক স্মার্টফোন বাজার প্রায় ১৩ শতাংশ কমতে পারে। ব্যক্তিগত কম্পিউটার বাজারও প্রায় ১১ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন ল্যাপটপ বা ফোন কেনার সময় বেশি র‍্যামযুক্ত ডিভাইস নেওয়াই ভালো। কারণ বেশিরভাগ আধুনিক ল্যাপটপে র‍্যাম পরে বাড়ানো যায় না। ভালো অফার পেলে দ্রুত ডিভাইস কিনে নেওয়াও বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে, কারণ ভবিষ্যতে দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উল্লেখ্য, ভারতের বাজার অনুযায়ী এ প্রতিবেদনে স্মার্টফোনগুলোর দাম দেওয়া হয়েছে। 

সূত্র : টাইমস অব ইন্ডিয়া